221818_171905456201435_3270187_n

বৃষ্টি দিনের শুকনো বকুল

বাইরে ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছে । ছ’তলা বাড়ির বারান্দায় দাড়িয়ে আছি । সামনে লোহার গ্রিল,  তাঁর ফাঁকে ফাঁকে অর্কিডের গাঢ় সবুজ পাতা। কিছুদূরে দেখা যাচ্ছে হুলুদ রাঙা ফুলে ছাওয়া একটা কদম গাছ। পাশের ঝিল থেকে দুটো গাঙছিল হঠাৎ উড়ে গেল কদমের শাখায় ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে ।  চারিদিকের মাতাল করা এই সুরভিতে শরীর মন হয়ে উঠেছে আনমনে। এমন একটা দিনে নিশি পাশে থাকলে সবকিছু হয়ত অন্যরকম হত।

প্রায় দু বছর আগের কথা । আমার এই এলোমেলো জীবনে নিশির স্মৃতিগুলো ঢেউয়ের মুখে কচুরিপনার মত এলোমেলো হয়ে গেছে। কখনো কখনো তারি দুএকটা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় মনে পরে যায়। স্পষ্ট অতীত হয়ে যাওয়া সেই দিনগুলো আজও আমাকে অস্থির করে তুলে, অকারনেই মন ভারী করে দেয়।

সেদিন ছিল আজকের দিনটার মতই । আকাশ এতটা ভারী ছিল না, তবু বৃষ্টি হচ্ছিল খুব । আমি বই বন্ধ করে সবেমাত্র বারান্দায় যাব যাব করছিলাম। এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল। বারান্দায় গিয়ে আমার চোখ কপালে উঠল। নিশি ওর কয়েকজন বান্ধবীসমেত আমাদের বাসার সামনে এসে হাজির।  এই আসাই নিশির আমার কাছে আর দশটা  সাধারন মেয়ের মত করে আসা । এর পর থেকে শুরু হয়ে যায় ভাল লাগা না লাগার পালা, কাছে আসা বা না আসার অপেক্ষা ।

অন্য কারোর উপর যদিও কিছু ভাললাগা ছিল, তবে নিশি যেদিন আমার হবে কথা দিয়েছিল সেদিন থেকে সহজেই ঐ সব ভাল লাগা ফিকে হয়ে আসল। আমার মন জুড়ে জায়গা করে নিল নিশি । যেন  এ আমার পরম পাওয়া, বহুযুগের সাধনার ফসল । এমনি আরও অনেক উপমা অলংকারে মন হয়ে উঠল নব প্রেমে  উন্মুখ।  শুরু হল টিনএজ প্রেম,  যেন  রবীন্দ্রনাথের কবিতার মতই মনকারা, আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে রই আর ভাবি,

“ আমরা দু’জনে ভাসিয়া এসেছি যুগল প্রেমের স্রোতে

অনাদি কালের হৃদয় উৎস হতে

আমরা দুজনে খেলিব খেলা কোটি প্রেমিকের মাঝে”

এখনো মনে পরে ময়মনসিংহ শহরের কথা, সার্কিট হাউসের কথা। যেখানে আমারা দুজনে কাটিয়েছি অতি চঞ্চল বাড়ন্ত যৌবনের কিছু দারুন মুহূর্ত । এখানেই আমাদের প্রথম ডেট, প্রথম হাত ধরা, সমান্তরালে হেঁটে বেড়ানো, কাছ থেকে আরও কাছে আসা। অনেক অবুঝ ছিল মেয়েটা। ওকে নিয়ে বাইরে বের হতে আমার একটু ভয় হত। কখন, কার সামনে কি করে বসে এই ভয়ে। তবে যতক্ষণ আমার পাশে থাকত ভীষণ ভাল লাগত আমার।  বুঝাতে চাইতাম আমি আরও কিছুক্ষণ ওর পাশে থাকতে চাই। বুঝত ঠিকই, কিন্তু তবুও চলে যেত।

বৃষ্টির দিনগুলাতে আমি ছিলাম খুব অসহায়। এখনও যখন বৃষ্টি হয় আমি সব কাজ ফেলে রেখে তাকিয়ে থাকি বৃষ্টির দিকে। জানি না বৃষ্টি আমাকে এত আনমনে করে দেয় কেন? কোন এক বৃষ্টির দিন নিশি আমাকে খুব অস্তে করে কিরকম একটা মায়াবী কণ্ঠে বলল, “আমার কি ইচ্ছে হয় জানো, যেদিন খুব বৃষ্টি হবে তোমাকে সাথে করে অনেক দূরে কোথাও যাব। আমার পরনে থাকবে লাল শাড়ি আর তোমার সাদা পাঞ্জাবি। আমি তোমার হাত ধরে হাঁটব আর বৃষ্টিতে ভিজব । বৃষ্টির সাদা স্নিগ্ধ জল তোমার শরীর গড়িয়ে পড়বে আমার শরীরে, আর আমি তোমার শক্ত বাহু বন্ধনে  আবদ্ধ হব  শোন, যদি পার আমাকে একটা বকুলের মালা দিও, আমি বকুল অনেক ভালবাসি। তোমার চাইতেও বেশি’…  বলেই প্রচণ্ড হাসিতে মেতে উঠল নিশি।।

ময়মনসিংহ শহরের এক পাশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন এক মোড়ের সামনে থেকে কেনা বকুলের মালা পকেটে করে ঘুরে বেড়ালাম বহুদিন।  কিন্তু দেওয়া হয় নি। কথা ছিল যেদিন খুব বৃষ্টি হবে, চারিদিক মাতাল করে বেজে উঠবে বর্ষার মায়াবী  সুর, তেমন এক দিনে বৃষ্টির সাদা জলে ভেজা রেললাইন ধরে খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে  নগরীর কোলাহল ছাড়িয়ে যদি পৌঁছাতে পারি ব্রহ্মপুত্রের ধার ঘেঁষে নীরবে দাঁড়ানো দেবদারুর কিংবা আমের  বাগানে তখনই নিশির হাতে পরিয়ে দিব আদরের এই বকুলের মালা।

 

কিন্তু সেদিন আর আসল না। মান অভিমানের পালা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে গেল।  মালাটাও শুকিয়ে  গেছে, সব সুগন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে ইথারে ইথারে । শুকনো এই বকুলের মালাটাই এখন নিশি’র হয়ে আমার ভবঘুরে এই  জীবনের সঙ্গী হয়েছে।  নিশি যদি আবার ফিরে আসে কোনদিন তাহলে শুকনো এই বকুলের মালাটা দিয়ে বলব,  বকুল ফুলগুলো শুকিয়ে গেছে কিন্তু ভালবাসা কিন্তু শুকায়নি, বিশ্বাস না হলে মালা গেতে দেখতে পারো ।  দেখা যাক সে কবে ফিরে আসে, কিভাবে আসে ।

 

30868_110404389005294_100001072010331_73205_6996810_n

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *